ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ , ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জ কালবৈশাখীর তাণ্ডব, বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে বিপর্যস্ত জনজীবন, ৩ জনের প্রাণহানী

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৪-২৮ ১৯:৪৮:১৬
হবিগঞ্জ কালবৈশাখীর তাণ্ডব, বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে বিপর্যস্ত জনজীবন, ৩ জনের প্রাণহানী হবিগঞ্জ কালবৈশাখীর তাণ্ডব, বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে বিপর্যস্ত জনজীবন, ৩ জনের প্রাণহানী
লিটন পাঠান, হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হবিগঞ্জ জেলায় চলমান কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন ৪-৫ বার করে বজ্রপাত, দমকা হাওয়া, প্রবল ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতসহ শিলাবৃষ্টি আঘাত আানছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে একদিকে যেমন বেড়েছে মানুষের দুর্ভোগ, অন্যদিকে তেমনি ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। গতকাল সোমবার (২৭ এপ্রিল) কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জেলায় অন্তত ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নবীগঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে মকসুদ মিয়া (৩৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকালে উপজেলার পানিউমদা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত মকসুদ মিয়া ওই গ্রামের মৃত ছাবর উল্লাহর ছেলে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিকেলে বাড়ির পাশের নোয়াগাঁও গড়দার হাওরের মাঠ থেকে গরু আনতে গেলে আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া। এদিকে বানিয়াচং উপজেলার চাকনিয়া হাওড়ে বজ্রপাত থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আব্দুস ছালাম (৬০) নামে এক ধানকাটা শ্রমিক মারা গেছেন। তিনি জাতুকর্ণ পাড়া মহল্লার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে মাঠে কাজ করা শ্রমিকরা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় আব্দুস ছালাম কাছাকাছি একটি যাত্রী ছাউনিতে আশ্রয় নিতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, একই দিনে চুনারুঘাট-বাল্লা সড়কের জারুলিয়া এলাকায় ঝড়ের কবলে পড়ে সিএনজি চালক ছনখলা গ্রামের ছায়েদ আলীর মৃত্যু হয়েছে। কালবৈশাখীর এই তাণ্ডবে হবিগঞ্জের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে উঠেছে। ঝড়ের দমকা হাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর, ফলে বারবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, জরুরি তথ্য আদান-প্রদানেও দেখা দিচ্ছে সমস্যা। শিক্ষার্থী ও অনলাইন নির্ভর মানুষজন বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও দিনমজুররা। হাওরাঞ্চলের পাকা ধান পানিতে নুয়ে পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রেই জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের বছরের একমাত্র ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষদের অবস্থা আরও করুণ। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা মাঠে কাজ করতে পারছেন না, ফলে আয় বন্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার খাদ্যসংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন ঝড়-বৃষ্টির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা যাতায়াতে সমস্যায় পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা ও ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তাঘাট কাদামাটিতে ভরে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব বড় একটি সমস্যা। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষিশ্রমিকরা খোলা মাঠে কাজ করার সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তারা কৃষক ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য আরও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে কালবৈশাখীর এই তাণ্ডবে হবিগঞ্জ জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন মানুষ। আবহাওয়ার এমন বিরূপ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ